রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর করার পর চাকরি-বাকরি না খুঁজে ফ্রিল্যান্স অনুবাদের কাজ শুরু করেন তোয়াসিন অফি। প্রথমে বাসায় বসে ব্যক্তিগত পরিসরে শুরু। এরপর একসময় নিজেই একটি এজেন্সি প্রতিষ্ঠা করেন। তাতে ভালোই চলছিল তাঁর, ছিল সচ্ছলতা, স্বপ্ন ছিল আরও বড় হওয়ার। কিন্তু কোভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর সব বদলে গেছে। অফিস তো বন্ধই, প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েও কাজ চালানো সম্ভব হচ্ছে না, যা করছেন ব্যক্তিগত পরিসরে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর করার পর চাকরি-বাকরি না খুঁজে ফ্রিল্যান্স অনুবাদের কাজ শুরু করেন তোয়াসিন অফি। প্রথমে বাসায় বসে ব্যক্তিগত পরিসরে শুরু। এরপর একসময় নিজেই একটি এজেন্সি প্রতিষ্ঠা করেন। তাতে ভালোই চলছিল তাঁর, ছিল সচ্ছলতা, স্বপ্ন ছিল আরও বড় হওয়ার। কিন্তু কোভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর সব বদলে গেছে। অফিস তো বন্ধই, প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েও কাজ চালানো সম্ভব হচ্ছে না, যা করছেন ব্যক্তিগত পরিসরে।

তবে ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ নির্ভর করছে এখানকার প্রতিষ্ঠানগুলো কোন দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করছে, তার ওপর। আইটিভিত্তিক ফ্রিল্যান্স এজেন্সি ভিসের এক্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফয়সাল মোস্তফা বলেন, যেসব দেশ খুব একটা আক্রান্ত হয়নি, তারা টুকটাক কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, যেমন কানাডা। তাই কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান এখনো কাজ চালিয়ে নিতে পারছে। আবার কাজের ধরনের ওপরও এই সময় কাজ প্রাপ্তি নির্ভর করছে বলে জানান তাঁরা। অনেকে আবার কম রেটে কাজ করছেন। তবে অনেক প্রকল্পই বাতিল হয়েছে। এই খাতের অনেক কর্মী কাজ হারাচ্ছেন। এই চিত্র ফ্রিল্যান্সিংয়ের প্রায় সব ক্ষেত্রের । কর্মীদের বেতন দিতে পারছেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে আরেক আইটিভিত্তিক ফ্রিল্যান্সিং এজেন্সির কর্ণধার নাম প্রকাশে অনিচ্ছা জানিয়ে বলেন, ‘এখনো দিতে পারছি। তবে এই পরিস্থিতি আরও দীর্ঘায়িত হলে কী হবে বলা যায় না। আমরা শঙ্কিত।’

বেসিস সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন, ‘উন্নত দেশে লক ডাউন চলছে বলে ফ্রিল্যান্সারদের কাজ কমে গেছে। আবার ফ্রিল্যান্সারদের ট্রেড লাইসেন্স বা আইনি সত্তা না থাকায় সরকারের প্রণোদনার আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছেন তাঁরা। বেসিসের পক্ষ থেকে আমরা চেয়েছিলাম, ফ্রিল্যান্সারেরা একটা কাঠামোর মধ্যে আসুক। কিন্তু সেটা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। অন্যদিকে মূল প্রতিষ্ঠানগুলো যে তাদের ক্ষতিপূরণ দেবে, তাও বোধ হয় সম্ভব নয়। এ জন্য কাঠামো থাকলে সুবিধা হতো। তবে যারা এখনো কিছু কাজ দিচ্ছে, তারা অনেকেই কাজের জন্য বেশি মূল্য দিচ্ছে।’

এই পরিস্থিতিতে আলমাস কবীরের পরামর্শ হচ্ছে, ফ্রিল্যান্সাররা যেন তাদের কাজের পরিসর বৃদ্ধি করে, শুধু বৈশ্বিক বাজারের দিকে তাকিয়ে না থেকে স্থানীয় বাজারের সম্ভাবনাও যেন তারা খুঁজে দেখে।

ব্যাপারটা হলো, স্বাস্থ্য সেবা সুবিধা বা আপৎকালীন সুবিধা না থাকলে এই কর্মীরা মহামারির মতো সময় মহাবিপাকে পড়েন। উন্নত দেশগুলোতেও এই বিতর্ক ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। সেসব দেশে অবশ্য বেকার ভাতা আছে, গিগ কর্মীদের অনেকেই বেকার ভাতার আবেদন করেছেন। সেখানেও এই ভাতা পেতে নানা বিপত্তির মুখে পড়ছেন এই কর্মীরা। কিন্তু বাংলাদেশ তো সেই সুযোগ নেই, এই দুর্যোগে নিজেদের ব্যবস্থা নিজেদেরই করতে হচ্ছে তাঁদের।

অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, ‘গিগ অর্থনীতিতে নতুন কাজের সংস্থান হয়েছে। কাজের নতুন ধারণা নিয়ে এসেছে এই খাত। আমি মনে করি, দেশের জিডিপিতে এদের অবদান কতটা, তা পরিমাপ করা উচিত। অন্যান্য খাত যেমন সরকারের সহায়তা পাচ্ছে, তেমনি তাদেরও পাওয়া উচিত। বৈশ্বিক ব্যান্ডগুলোকেও এখন দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। এরা এত দিন তাদের হয়ে কাজ করেছে, তা-ই এই মুহূর্তে ফ্রিল্যান্সারদের কিছু ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত তাদের।’

গিগ অর্থনীতির অন্যান্য খাতের মধ্যে রাইড শেয়ারিংয়ের কর্মীরা একেবারে বেকার হয়ে পড়েছেন। সরকারের নির্দেশে রাইড শেয়ারিং সেবা বন্ধ আছে। রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই পরিস্থিতিতে রাইডারদের সহায়তা করার পথ খুঁজছে তারা। ইতিমধ্যে কিছু সহায়তা করাও হচ্ছে। ( সৌজন্যে প্রথম আলো )

গিগ অর্থনীতিতে ভারতের পরেই আমাদের অবস্থান

গিগ ইকোনমি বা শেয়ারড অর্থনীতির ক্ষেত্রে দ্রম্নত এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। রাইড শেয়ারিং, ই-কমার্স, অনলাইন মার্কেটপেস্নস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অ্যাপভিত্তিক নানা কাজে যুক্ত হচ্ছেন দেশের তরুণরা। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে গিগ অর্থনীতির দিক থেকে ভারতের পরই বাংলাদেশের অবস্থান বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই গিগ অর্থনীতির বিষয়টি বেশ কিছুদিন ধরেই প্রযুক্তি দুনিয়ায় আলোচিত হচ্ছে।

গিগ ইকোনমির সংজ্ঞায় বলা হচ্ছে, ‘গিগ ইকোনমি’ এমন একটা পরিবেশ, যেখানে অস্থায়ী চাকরির ছড়াছড়ি থাকবে আর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান স্বল্পমেয়াদি চুক্তিতে স্বতন্ত্র কর্মীদের (ইন্ডিপেন্ডেন্ট ওয়ার্কার্স) নিয়োগ দেবে। তারা ফুল টাইম কর্মীদের চেয়ে ফ্রিল্যান্সারদের গুরুত্ব বেশি দেবে এবং বেশির ভাগ কাজ এই ফ্রিল্যান্সারদের দিয়েই করাবে। এই ধারার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার ক্ষমতাকে বা এই রকম ফ্রিল্যান্স দক্ষতাগুলোকে বলা হচ্ছে, ‘গিগ ক্যাপাসিটি’। যেই দেশ বা শহর যত বেশি প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত ও গতিশীল, সেই দেশে বা শহরে এই ‘গিগ ক্যাপাসিটিসম্পন্ন’ লোকবলের দরকার বেশি হবে। মজার ব্যাপার হলো, এই গিগস রাই, কিন্তু হবে শহুরে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।

অর্থনৈতিক বোদ্ধারা বলছেন, উন্নত বিশ্বে এই ধারা ইতোমধ্যে পরিলক্ষিত হচ্ছে এবং ধারণা করা যাচ্ছে, ২০২০ সালের মধ্যে প্রায় ৪০ ভাগ আমেরিকান চাকরির এই ধারা (ট্রেন্ড) দ্বারা প্রভাবিত হবেন, যা আস্তে আস্তে পুরো বিশ্বে ছড়াবে। বাংলাদেশও ইতোমধ্যে গিগ অর্থনীতিতে শক্তিশালী অবস্থানে চলে এসেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, শুধু  ফ্রিল্যান্সিং মার্কেট-পেস্নসে সাড়ে ছয় লাখ ফ্রিল্যান্সার কাজ করছেন।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ হোসেন জিলস্নুর রহমানের মতে, নতুন প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে গিগ ইকোনমির মতো বিষয়গুলোতে আগ্রহ বাড়ছে। গিগ ইকোনমিতে কাজের বিষয়-গুলো কতটা সঙ্গতিপূর্ণ বা টেকসই হচ্ছে কিনা, তা ভেবে দেখতে হবে। ফ্রিল্যান্সারদের হাত ধরে বাংলাদেশে গিগ ইকোনমির ধারাটি শুরু হয়েছে। এটা কতটা প্রভাব ফেলবে, তা গবেষণা জরুরি। বিশ্বের অনেক দেশে এখন গিগ অর্থনীতি ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলছে। অনেক কাজ হচ্ছে ঘরে বসে। বাজার অনেক প্রতিযোগিতামূলক আর দ্রম্নত পরিবর্তনশীল। দেশের গিগ ইকোনমি কোন পর্যায়ে, এখন তা জানাটা জরুরি। যে অর্থনীতির দিকে আমরা যাচ্ছি, তার আয়বণ্টন কেমন হবে, শ্রমিকরা কতটুকু পাবেন, নতুন ধারা নিয়ে কাজ করতে হবে। তবে এটা যে দেশের অর্থনীতির অন্যতম ধারা হবে, তা নিয়ে দ্বিমত নেই। তবে উদ্বেগের জায়গা হচ্ছে, মানসম্মত কর্মসংস্থান। এটা নিয়ে গবেষণা করে তার ফলাফলের ভিত্তিতে নীতিমালা তৈরিতে জোর দিতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান এডিসন রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৪ সালের তুলনায় বর্তমানে ফ্রিল্যান্সারের সংখ্যা ৩০০ গুণ বেড়েছে। প্রায় ছয় কোটি আমেরিকান বর্তমানে ফ্রিল্যান্সের সঙ্গে যুক্ত। এটা ধারণা করা হচ্ছে যে, ২০২৭ সালের মধ্যে আমেরিকার বেশির ভাগ কর্মীই ফ্রিল্যান্সের সঙ্গে যুক্ত হবেন।

ফ্রিল্যান্সিং পস্ন্যাটফর্ম আপওয়ার্ক ও ফ্রিল্যান্সার্স ইউনিয়নের সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মোট শ্রমশক্তির চেয়ে তিন গুণ দ্রম্নত বাড়ছে ফ্রিল্যান্সিং শ্রমশক্তি। এ ক্ষেত্রে নতুন প্রযুক্তি বস্নক চেইন, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ফ্রিল্যান্সিং কর্মী নিয়োগের ইচ্ছা বড় ভূমিকা রাখবে। দূর-নিয়ন্ত্রিত কর্মীদের চাহিদাও এখন বাড়ছে। ফ্লেক্সজবস নামের অনলাইন পস্ন্যাটফর্মের কর্মকর্তারা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রে ১৭০টি ভার্চু্যয়াল কোম্পানি কাজ করছে। ২০১৪ সালে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ২৬। এর মধ্যে রয়েছে অটোমেটিক, আনসার কানেক্ট, ইনভিশন ও টপটালের মতো বড় প্রতিষ্ঠান।

গিগ ইকোনমির দিক থেকে বিবেচনায় এশিয়ার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ভারত। কিন্তু ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে এশিয়ার অন্যান্য দেশ দ্রম্নত এগিয়ে যাচ্ছে।

বৈশ্বিক ফ্রিল্যান্সিং অ্যান্ড আউটসোর্সিং মার্কেটপেস্নস ফ্রিল্যান্সার ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও ভারতে গিগ অর্থনীতি দ্রম্নত বিকশিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির ২০১৬ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গিগ অর্থনীতির দিক থেকে ভারত বিশ্ব ও এশিয়া অঞ্চলে নেতৃত্ব দেবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশও সম্ভাবনাময়। বাংলাদেশের গিগ ইকোনমি এগিয়ে নিতে ফ্রিল্যান্সার ও ছোট উদ্যোক্তারা বড় ভূমিকা রাখছেন।

Write A Comment

five × 1 =

By continuing to use the site, you agree to the use of cookies. more information

The cookie settings on this website are set to "allow cookies" to give you the best browsing experience possible. If you continue to use this website without changing your cookie settings or you click "Accept" below then you are consenting to this.

Close